জিবি সময় অনলাইন ডেস্ক : [৫]সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ডাকাত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ঘোরাফেরার খবর ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলা অপরিচিত কাউকে দেখলেই আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন স্থানীয়রা। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক গ্রামেই বাসিন্দারা স্বেচ্ছাসেবী পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
গ্রামে গ্রামে সতর্ক পাহারা, নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিচ্ছে জনগণ
সিলেটের বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দারা রাতভর পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। বাঁশ, লাঠি ও দড়ি হাতে পাহারা দিচ্ছেন তরুণ-যুবকেরা। তারা দল বেঁধে রাতে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন এবং অপরিচিত কাউকে দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
গ্রামবাসী জানান, “পুলিশ মাঝেমধ্যে টহল দিলেও আতঙ্ক এতটাই বেশি যে, আমরা নিজেরাই পাহারা না দিলে নিরাপদ মনে করি না।”
কিছু গ্রামে সংগঠিতভাবে পাহারার সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রামবাসী ভাগ হয়ে রাতের বিভিন্ন সময়ে পাহারা দেন, যাতে সারারাত গ্রাম নিরাপদ থাকে।
মসজিদের মাইকে রাতভর ঘোষণা
বিভিন্ন গ্রামে ডাকাত সন্দেহে কাউকে দেখলেই মসজিদের মাইকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “কোনো অচেনা লোক দেখা গেলেই মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়— ‘গ্রামের সবাই সতর্ক হন, ডাকাত থাকতে পারে।’ এতে সবাই দ্রুত একত্রিত হন।”
কিন্তু অনেক সময় এই ঘোষণা গুজবের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কিছু নিরীহ মানুষও সন্দেহের ভিত্তিতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের টহল ও পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন পুলিশের টহল বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, পুলিশ মাঝে মাঝে টহল দিলেও সেটি নিয়মিত নয়।
একাধিক গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডাকাতির ঘটনা ঘটলে তদন্ত হয়, কিন্তু আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ডাকাতরা যখন পালিয়ে যায়, তখন পুলিশ এসে উপস্থিত হয়।”
এক শিক্ষক বলেন, “গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথসহ বেশ কিছু এলাকায় সম্প্রতি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।”
গুজব নাকি বাস্তব? প্রশাসনের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডাকাতির ঘটনা যতটা না ঘটছে, তার চেয়ে বেশি গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তবে গ্রামবাসীরা এটিকে গুজব বলে মানতে নারাজ।
যুবসমাজ বলেন, “গুজব হলে কেন আমরা নিজেরাই পাহারা দিতে বাধ্য হচ্ছি? কেন আমাদের রাত জাগতে হচ্ছে?”
তাদের মতে, আতঙ্ক ও গুজব ছড়িয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কিছু মানুষ নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে, যা নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।
জনগণের দাবি: কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পুলিশের নজরদারি
সাধারণ মানুষ দাবি তুলেছেন, প্রশাসনকে শুধু আশ্বাস দিলেই হবে না, বরং নিয়মিত টহল, সন্দেহভাজনদের শনাক্ত এবং জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। নাহলে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
এক বাসিন্দা বলেন, “গ্রামের মানুষ নিজেরাই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে, তাহলে পুলিশের দরকার কী? প্রশাসন যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করত, তাহলে আমরা পাহারা দিতে বাধ্য হতাম না।”
ওসির বক্তব্য: আতঙ্ক গুজব থেকে ছড়াচ্ছে
গোলাপগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান মোল্যা বলেন, “এই আতঙ্কের মূল কারণ সচেতনতার অভাব এবং অনলাইন মিডিয়া ও লাইভ প্রচারের অপব্যবহার। অনেক সময় কোনো ঘটনা পুলিশ জানার আগেই তা অনলাইনে ভাইরাল হয়ে যায়, যা গুজব ছড়ায়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করেই আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। চোর ধরলেই অনেকে ডাকাত বলে গুজব ছড়াচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত।”
পুলিশের টহল ও চেকপোস্ট ব্যবস্থা
ওসি জানান, গোলাপগঞ্জে পুলিশের ১১টি টিম রাতভর টহল দিচ্ছে। এছাড়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ—হিলালপুর ও রানাপিং এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে অপরাধীরা ঢুকতে না পারে।
তিনি সবাইকে গুজবে কান না দেওয়ার এবং সন্দেহজনক কিছু ঘটলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানান।
আতঙ্ক কাটেনি, প্রশাসনের ওপর আস্থা কমছে
পুলিশের তৎপরতা বাড়লেও এখনো অনেক এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রশাসনের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না।
সচেতন বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে জনগণ আতঙ্ক থেকে মুক্ত হতে পারে।
(জিবি সময়/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে জিবি সময় লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]
