জিবি সময় অনলাইন ডেস্ক : [৫]বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। রাজধানীর ভাটারা থানার এ মামলায় গতকাল সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক বৃহস্পতিবার নুসরাত ফারিয়ার জামিন শুনানির দিন ধার্য করে এ আদেশ দেন। এদিকে নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার নিয়ে দেশ জুড়ে আলোচনার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, ‘নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তার একটা বিব্রতকর ঘটনা হয়ে থাকল আমাদের জন্য’। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘তার (নুসরাত ফারিয়া) নামে যদি মামলা থাকে, আপনি কী করবেন? ছেড়ে দিলে আবার বলবেন স্যার আপনি ছেড়ে দিছেন।’ সংস্কৃতি উপদেষ্টার বক্তব্য ব্যক্তিগত মত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত রবিবার থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করা হয় নুসরাত ফারিয়াকে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে। তাকে ভাটারা থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গতকাল সকাল ৯টার দিকে তাকে আদালত এলাকায় এনে প্রথমে রাখা হয় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানায়। সকাল ১০টার দিকে মাথায় পুলিশের হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিহিত নুসরাত ফারিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিকালে ৩০ মিনিট কাঠগড়ায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এ সময় চুপচাপ ছিলেন তিনি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (উপপরিদর্শক) বিল্লাল ভূঁইয়া নুসরাত ফারিয়াকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। তাকে আদালতে আনার ঘণ্টাখানেক পর এজলাসে তোলা হয়।
তার আইনজীবী মোহাম্মদ আরাভ জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘নুসরাত ৯ জুলাই বাংলাদেশ থেকে কানাডা যান। দেশে ফেরেন ১৪ আগস্ট। তিনি আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। এ বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টও করেছেন।’ রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। ঘটনার সময় নুসরাত ফারিয়া দেশের বাইরে ছিলেন কি না, আন্দোলনের পক্ষে পোস্ট করেছেন কি নাএ বিষয়ে আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর জামিনের বিষয়ে ২২ মে (বৃহস্পতিবার) শুনানির জন্য দিন ধার্য করে আদালত। প্রসঙ্গত, গত ২৯ এপ্রিল এনামুল হক নামের এক ব্যক্তি নায়িকা নুসরাত ফারিয়া, অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, আশনা হাবিব ভাবনা, নায়ক জায়েদ খানসহ ১৭ অভিনয় শিল্পীসহ ২৮৩ জনের নামে এ মামলাটি করে। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গত বছরের ১৯ জুলাই ভাটারা থানার সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় গুলি চালানো হলে তা এনামুলের পায়ে লাগে। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘এখন তার নামে যদি কেস থাকে, আপনি কী করবেন? ছেড়ে দিলে আবার আপনি বলবেন স্যার আপনি ছেড়ে দিছেন।’ গতকাল দুপুরে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, রবিবার বিমানবন্দর থেকে এক চিত্রনায়িকা গ্রেপ্তার হয়েছেন। গতকাল সোমবার সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা গ্রেপ্তারের সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে, উপদেষ্টা বলেন, সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা কী বলেছেন, তা তিনি জানেন না। এটা যার যার ব্যক্তিগত মত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেউ যেন ভোগান্তির শিকার না হয়। এ জন্য তারা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবেন। শুধু দুষ্কৃতকারী যেন আইনের আওতায় আসে এবং শাস্তি ভোগ করে। একজন নিরীহ লোক যেন কোনো অবস্থাতেই শাস্তি ভোগ না করেন। এ ব্যবস্থা তারা অবশ্যই নেবেন। নুসরাত ফারিয়া প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তিনি কিছু বলতে চান না। নুসরাত ফারিয়া বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন, যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ বিষয়ে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন তার নামে যদি কেস থাকে, আপনি কী করবেন? ছেড়ে দিলে আবার আপনি কিন্তু বলবেন, স্যার, আপনি ছেড়ে দিছেন।’
এদিকে নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী। গতকাল বেলা ১১টা ১২ মিনিটে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত চেষ্টা করি আমার মন্ত্রণালয়ের কাজের বাইরে কথা না বলতে। কিন্তু আমার তো একটা পরিচয় আছে, আমি এ ইন্ডাস্ট্রিরই মানুষ ছিলাম এবং দুই দিন পর সেখানেই ফিরে যাব। নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তার বিব্রতকর একটা ঘটনা হয়ে থাকল আমাদের জন্য। আমাদের সরকারের কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা। ঢালাও মামলার ক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার অবস্থান প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। এবং সেই নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছিল।’ তিনি আরও লেখেন, ‘ফারিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাতো অনেকদিন ধরেই ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার বিষয় আমার নজরে আসেনি। কিন্তু এয়ারপোর্টে যাওয়ার পরেই এই ঘটনাটা ঘটে। আওয়ামী লীগের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিদেশ গমন কেন্দ্র করে ক্ষোভের পর ওভার নারভাসনেস থেকেই হয়তো বা এসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।’ সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও লেখেন, ‘কয়দিন আগে ব্যারিস্টার আন্দালিব পার্থের স্ত্রীর সঙ্গেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আমি বিশ্বাস করি, ফারিয়া আইনি প্রতিকার পাবেন। এবং এই ধরনের ঢালাও মামলাকে আমরা আরও সংবেদনশীলভাবে হ্যান্ডেল করতে পারব এই আশা। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের প্রধান কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা।’
নুসরাতের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে হাসনাত : চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, নুসরাত ফারিয়াকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে বোঝাতে চাচ্ছেন আপনারা খুব বিচার করছেন? এগুলো বিচার নয়, এগুলো হাসিনা স্টাইলে মনোযোগ ডাইভারশন।
গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি। ফেসবুকে হাসনাত লেখেন, সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিকে দেশ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, শিরীন শারমিনকে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বাসায় গিয়ে পাসপোর্ট করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল জানুয়ারিতে হওয়ার কথা থাকলেও মে মাসে এসেও শুরু হয়নি।
তিনি আরও লেখেন, ইন্টেরিম, ৬২৬ জনের লিস্ট কোথায়? ৬২৬ জনকে নিরাপদে বের করে দিয়ে এখন নুসরাত ফারিয়াকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে বোঝাতে চাচ্ছেন আপনারা খুব বিচার করছেন? এগুলো বিচার নয়, এগুলো হাসিনা স্টাইলে মনোযোগ ডাইভারশন।
(জিবি সময়/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে জিবি সময় লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]
