তত্ত্বাবধায়ক ফেরানোর আপিল শুনানিতে যা বলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল
দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক :তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে চূড়ান্ত আপিল শুনানি ৯ম দিনের শেষ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চে এ শুনানি শেষে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করেছেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান।
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনীর মহৎ উদ্দেশ্য ছিল জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রের মূল কথা হলো জনগণ ভোট দিতে পারবে। ভোটাধিকার প্রয়োগটাই এখানে মুখ্য। সে কারণে ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করা) আনা হয়েছিল। সেই ত্রয়োদশ সংশোধনী আপিল বিভাগ বাতিল করলেন মেজরিটির জাজমেন্ট দিয়ে। তার প্রধানত দুটি কারণ– একটি হলো এটা নির্বাচিত সরকার না। আরেকটি হলো এটাতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী আপিল বিভাগ বাতিল করলেন যে–বিচারকরা কে প্রধান বিচারপতি, প্রধান উপদেষ্টা হবেন সেই লোভ সামলাতে পারবেন না। যদি এইটাই সত্য হয় তাহলে যে সব বিচারপতি প্রধান বিচারপতি হওয়ার লোভে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে রায় দিয়েছিলেন সেই সিস্টেমটা তো বদলানো দরকার। প্রধান বিচারপতি হওয়ার লোভে আপনি রায় দেবেন, তারপর রায়ের পরে সবাই প্রধান বিচারপতি। আর সেই রায়টা যারা দেননি তারা কেউ প্রধান বিচারপতি হতে পারেননি। তাহলে ওইটার সঙ্গে এটা স্ববিরোধী হয়ে যায়।
আসাদুজ্জামান বলেন, প্রমাণিত হয়েছে নির্বাচিত সরকারই গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে না। প্রমাণিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে নিরপেক্ষভাবে, স্বাধীনভাবে, উন্মুক্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
এ সময় তিনি কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জুলাই বিপ্লবের ওপর জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই চিত্রই বলছে যে কারণে খায়রুল হক সাহেবরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছিলেন, ওই কারণ ছিল অযৌক্তিক, পক্ষপাত দুষ্ট, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সহায়ক না– সেটাই এর প্রমাণ।
রায় কার্যকর হওয়ার প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই যে জুলাই বিপ্লবের পরে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। রাজপথ থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে এদেশের সরকার প্রধান কে হবেন, কোন ফরমেটের সরকার হবে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি কে হবেন সেটাও রাজপথ থেকে বলে দেওয়া হয়েছে। এই যে রেভুলেশনের বিজয়ী শক্তি, এটাকে রেভুলেশনের থিওরি জুরিসপ্রুডেন্স বলে। এই থিওরি অনুসারে, এই সরকার একটা নির্বাচনের পথ ধরে হেঁটে গেছে। সেই নির্বাচনের পথে হাঁটতে যেয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। এই সরকারের পরবর্তী সরকার যারা আসবে সেখান থেকে যদি কার্যকর করেন সেখানে কোন ব্যত্যয় হবে না।
বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সরকারপ্রধান যখন ৫ আগস্ট পালিয়ে যায়, তার ক্যাবিনেট যখন পালিয়ে যায়, তার সংসদ সদস্যরা যখন পালিয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রপতির সামনে যখন কোনো পথ খোলা থাকে না। তখন রাষ্ট্রপতি ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে মতামত নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। এই সরকার গঠন শুধুমাত্র সুপ্রিম কোর্টের মতামতের উপর নির্ভর করে না। এটা রেভুলেশনারি থিওরি অনুসারে মুক্তিকামী জনগণ, বিজয়ী জনগণ, স্বাধীন জনগণ, গণভুত্থানের নেতৃত্বকারী জনগণ যেভাবে নির্ধারণ করবেন সেটাই সংবিধান, সেটাই আইন। সুতরাং রেভুলেশনারি থিওরিতে যে জুরিসপ্রুডেন্স একসেপ্ট করা হলো, এডপ্ট করা হলো সেই থিওরিটাকেই আমরা হাইলাইট করছি। ১০৬ সব নয়। ১০৬–এ মতামত দেওয়া হয়েছে। মুক্তিকামী জনগণ, বিজয়ী জনগণ, অভ্যুত্থান কারী জনগণ যখন ডিক্টেট করে আমার সরকার এইভাবে চলবে। দ্যাট ইজ দি বেসিক লেজিটিমেসি অব দিস গভমেন্ট। এই গভমেন্ট ওইভাবে চলবে।
এর আগে গত ২১, ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর, ২, ৪ ও ৫ নভেম্বর শুনানি হয়। এ ৮ দিনে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ জনের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া, ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এস এম শাহরিয়ার এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও রুহুল কুদ্দুস শুনানি সম্পন্ন করেছেন।
গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়।
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় ১৯৯৬ সালে। এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট করেন। ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ এ রিট খারিজ করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।
এই সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম সলিমউল্লাহসহ অন্যরা ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট রায় দেন।
এ রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের অনুমতি দেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে আপিল করে রিট আবেদনকারী পক্ষ। এই আপিল মঞ্জুর করে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন।
ঘোষিত রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে আনা পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর এ রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। অন্য চারজন হলেন- তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান।
আপিল বিভাগের ওই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ১৬ অক্টোবর একটি আবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এ ছাড়া রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছরের ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
পরে নওগাঁর রানীনগরের নারায়ণপাড়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে গত বছর একটি আবেদন করেন।
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন





