সিফাত বিনতে ওয়াহিদ: [৫]আওয়ামী লীগের পতনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে যেসব দল একজোট হয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল, নির্বাচনের পথে আসতেই তাদের অবস্থানে দেখা দিয়েছে বিস্তর ফাটল।
ঐকমত্য কমিশনের জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং গণভোটের সময়সূচিকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বিরোধ মুখোমুখি অবস্থানে গড়িয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান দুই সঙ্গীর মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক ময়দানে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।
১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে ‘নোট অব ডিসেন্টের’ উল্লেখ না থাকা, সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের ঘোষণা এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জুলাই সনদ কার্যকরের আদেশ জারি- এই তিন ইস্যু ঘিরে দিনে বিএনপির কঠোর সমালোচনা শোনা গেলেও রাতেই দলের অবস্থান পাল্টে যায় গণভোটের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে। অন্যদিকে একই ঘোষণাকে ‘বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রচেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পরপরই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দুপুরে মন্তব্য করেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা নিজের সই করা জুলাই জাতীয় সনদ লঙ্ঘন করেছেন।’ কিন্তু রাতেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে দলটি জানায়, নির্বাচন ও গণভোট একইদিনে আয়োজনের ঘোষণাকে তারা স্বাগত জানাচ্ছে। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আজ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তারিখ পুনর্ব্যক্ত করায় এবং গণভোটের ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপি তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
দিনেরবেলা যে ভাষণের সমালোচনা করা হয়, রাতেই তা কৌশলগতভাবে ধন্যবাদে পরিণত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির মূল লক্ষ্য যে কোনো মূল্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য তারা আগেই বহু বিষয়ে ছাড় দিয়েছেন। নির্বাচন ব্যাহত হলে তার দায় কোনোমতেই নিতে চায় না বিএনপি।
বিএনপির ঠিক বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। একই দিনে তাদের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘সনদের কার্যকারিতার জন্য জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অপরিহার্য।’
একইসঙ্গে তিনি নির্বাচন ও গণভোট একইদিনে আয়োজনের প্রস্তাবকে ‘বিভ্রান্তি’ বলে নিন্দা জানান। তিনি পরিষ্কারভাবে আহ্বান জানান, নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্ত যেন প্রত্যাহার করা হয়।
বিএনপি এখন যে কোনো মূল্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, এ ব্যাপারে অনড়। সে কারণেই ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংলাপে নানা প্রস্তাবে তারা ছাড় দিয়েছে, কেবল নির্বাচনের পথ খুলে রাখতে। অন্যদিকে ইসলামপন্থি আট দলের জোটসহ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনপূর্ব গণভোটের বিষয়ে অনড়। তাদের বক্তব্য, জুলাই সনদ আইনি ভিত্তি না পেলে দেশে কোনো নির্বাচনই হতে দেওয়া হবে না।
জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি আটদল জুলাই সনদের আইনিভিত্তি দেওয়ার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে থেকে বলছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট হতে হবে। সম্প্রতি এক সমাবেশে জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা জুলাই বিপ্লব মানবেন না, তাদের জন্য ছাব্বিশ সালে কোনো নির্বাচন নাই। ছাব্বিশের নির্বাচন দেখতে হলে আগে জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি লাগবে। আর জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে হবে। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। এই আইনি ভিত্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
গণভোট ইস্যুতে জামায়াতের অনড় অবস্থানের বিপরীতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বুধবার (১২ নভেম্বর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় বলেন, ‘দেশে আলু চাষিদের যে ভর্তুকি প্রয়োজন, আবদার মেটাতে গিয়ে গণভোট করতে গেলে সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে। গণভোটের চেয়ে আলু চাষিদের ন্যায্যমূল্য পাওয়া বেশি প্রয়োজন।’
তিনি এ সময় আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল যদি নিজেদের ইচ্ছে মতো দাবি আদায় করে নিতে চায়, সেটি তাদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে কিছু দল, যারা রাজপথে আমাদের সঙ্গী ছিল, তারা নির্বাচন নিয়ে জটিলতা তৈরি করছে। পতিতদের ফেরার সুযোগ তৈরি করছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুপ্ত থাকা দলটির ছাতার নিচে পতিত ফ্যাসিস্টরা আশ্রয় নিয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।’
তার এই বক্তব্যে স্পষ্টতই গণভোট এবং পিআর ইস্যুতে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে পথচলা বিএনপি-জামায়াত। এক সময়ের জোটসঙ্গীদের সমালোচনায় দুই দলের নেতারাই রাজপথে এখন বেশ সরব রয়েছেন। দুই দলের বিপরীতমুখী অবস্থান জনমনে অস্বস্তি তৈরি করেছে। বর্তমানে দল দুটির অবস্থান রীতিমতো দুই মেরুতে। আবার জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্য দলগুলোও একেক সময় একেক দিকে ঝুঁকছে। এতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেকের মনে নানা শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ফ্যাসিস্টদের নানাভাবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই তীব্র মতবিরোধ এখন সাধারণ মানুষেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সুপারিশমালা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে হস্তান্তর করেছে তা নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে বিএনপির। দলটি বলছে, তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ লিপিবদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি ছিল সনদে, কিন্তু সেটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি জুলাই সনদে না থাকলেও তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে এক দিনে গণভোটের কথা বলছে। ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের মাধ্যমে বিএনপির সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে যাচ্ছে।
বিএনপি চাইছে যে কোনো মূল্যেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, দেশের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই ভোটের মাধ্যমে জনগণই ঠিক করবে কে সংসদে যাবে, কে তাদের প্রতিনিধি হবে এবং কাদের উপর তারা দেশের দায়িত্ব অর্পণ করবে। এ কারণেই তারা দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে অনেক বিষয়ে ছাড় দিয়েছেন বলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বারবার দাবি জানিয়ে আসছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনকে ঘিরে একের পর এক সংকট সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করছেন বিএনপির নেতারা। এ প্রসঙ্গে ১২ নভেম্বর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বর্তমানে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে করি না। গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার চক্রান্ত চলছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে তা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর এসব কৌশলকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেছেন, ‘জনগণের দ্বারা বিএনপির বিজয় ঠেকাতে অপকৌশল গ্রহণ করে; সেটি মনে হয় শেষ পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে কিনা সে ব্যাপারে তাদেরও সতর্ক থাকা দরকার।’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে হুমকি-ধমকি না দিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে জনগণের মুখোমুখি হতে ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান জানান তারেক রহমান।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপিকে চাপে রাখতেই জামায়াতে ইসলামী একের পর নতুন ইস্যু তৈরি করে রাজপথে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে বিএনপি। তারা বলছেন, আগে জামায়াত পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি তুলে মাঠ গরমের চেষ্টা করেছিল। সেই দাবিতে টিকে থাকতে না পেরে এখন তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। জামায়াত নেতারা নভেম্বরের মধ্যেই গণভোটের দাবিতে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। এটা মূলত রাজনৈতিক কৌশল। বিএনপিকে চাপে ফেলে তারা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
বিএনপির বিপরীতে এবার শক্ত প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠার চেষ্টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও গুঞ্জন আছে ভেতরে-ভেতরে আসন সমঝোতার জন্য তারাও আলাপ চালাচ্ছে বিএনপির সঙ্গে।
বিএনপির দাবি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নির্বাচনের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনীতিতে এখন একক খেলোয়াড় বিএনপি। তাই শক্তিশালী দল হিসেবে তাদের সঙ্গে থেকেই ভোটের মাঠে নামতে আগ্রহী ছোট-বড় অন্যান্য দল। জয় তুলে সংসদে যাওয়াই বেশির ভাগের লক্ষ্য। আর মিত্রদের টেনে তুলতে হাত প্রসারিত করছে বিএনপিও। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের পক্ষে বিএনপি হাইকমান্ড। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বারবারই সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের কথা বলে আসছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিএনপি একক সরকার গঠন করবে না। সবাইকে নিয়েই আমরা সরকার গঠন করার অঙ্গীকার করেছি। আমাদের ৩১ দফাতেও সেই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ আছে। আমরা তো সংস্কারের কথা অনেক আগে থেকেই বলছি। অথচ আমরা সংস্কারবিরোধী বলে এক দল প্রচারণা চালাচ্ছে। হাসিনার আমলে তারা একজনও সংস্কারের কথা মুখে আনেননি। আমরাই প্রথম সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছি। কেউ যদি অহেতুক সংকট সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল বানাতে চায়, তার দায় তাদেরকেই নিতে হবে। জনগণ এ ধরণের অপকৌশল রুখে দেবে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর জনমানুষের মনস্তাত্ত্বিক যে পরিবর্তন হয়েছে, তা বুঝতে না পারলে এর কঠিন জবাব দেবে জনগণ। বাংলাদেশের মানুষ আর সাংঘর্ষিক রাজনীতি দেখতে চায় না।’
তবে, এমন কথা উড়িয়ে দিচ্ছে জামায়াত। দলটি মনে করে, স্বতন্ত্র আদর্শ ছাড়া কেবল জোটের সরল অংক খুব বেশি কাজে আসবে না এবারের নির্বাচনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আগেভাগে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে জামায়াত। এতে বোঝা যায়, আগামী নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের শক্তিমত্তা জানান দিতে চাচ্ছে। তবে বিএনপি ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। অযথা কোনো কর্মসূচি বা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এটাকে ভালোভাবে নিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী আমল পেরিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগই এখন নাগরিকদের প্রধান দাবি। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কারণে মতবিরোধ থাকবেই। সবাই সব বিষয়ে একমত হয়ে যাবে, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রত্যেকের নিজস্ব মতামত থাকবে। এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা। ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই সঠিক সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের অবস্থান সুদৃঢ় থাকতে হবে।’
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করলেও সারা দেশে দলীয় প্রার্থী তালিকা ঠিক করে রেখেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও নেতাদের দাবি, এটি প্রাথমিক তালিকা। যে কোনও সময় তা পরিবর্তন হতে পারে। সবকিছু মাথায় রেখেই চলছে যাবতীয় প্রস্তুতি।
বেশ কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের ভূমিধস জয়ের পর জামায়াতে ইসলামী বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। তবে নব্বই পরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এককভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করলে দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলের আসনে জয়ী হওয়াও অনিশ্চিত। অন্য শীর্ষ নেতাদের বেলায়ও একই অবস্থা। তবে দলের নেতারা মনে করছেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াত সরকার গঠনও করতে পারে। দলের জনসমর্থন বেড়েছে বলে তাদের দাবি।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর এখন পর্যন্ত মোটামুটি গ্রহণযোগ্য চারটি সংসদ নির্বাচনে জামায়াত তেমন সাফল্য পায়নি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ১৮টি আসনে জামায়াত জয়লাভ করে। মোট ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পড়ে দলটির পক্ষে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে এককভাবে মাত্র তিনটি আসন ও মোট ভোটের ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ পেয়ে চতুর্থ হয় জামায়াত। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট থেকে ৩১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১৭টি আসন ও ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পায় দলটি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় নির্বাচনে পায় মাত্র দুটি আসন ও ৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের নির্বাচনগুলোর সমীকরণই বলে দেয়, জামায়াতে ইসলামী সুশৃঙ্খল দল হিসেবে পরিচিত হলেও দেশের বৃহত্তর মানুষের কাছে তাদের এখনো সে রকম গ্রহণযোগ্যতা নেই। একাত্তর সালে জামায়াতের ভূমিকার কথাও জনমানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী আমলের দীর্ঘ যাঁতাকলের মধ্যে থাকা দলটি যে কোনো মূল্যেই আগামী নির্বাচনে ক্ষমতা হাতছাড়া করতে চাইবে না, আর এ কারণেই তারা মরিয়া হয়ে সব ধরনের কৌশল কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
এদিকে গত ৩ নভেম্বর বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে নির্বাচনী উৎসব, উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনার আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছু জায়গায় মনোনীত প্রার্থীদের নিয়ে অসন্তোষ-বিক্ষোভ দেখা গেলেও রাজধানী এবং এর বাইরে সকল জেলাতেই এখন প্রতিদিনই নির্বাচনী প্রচারণা চলছে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে। নির্বাচনী এই প্রচারণাতেই জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপি নেতারা। ১৩ নভেম্বর নিজ নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ শহরের ট্রাক টার্মিনাল মাঠে এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘জামায়াত বলছে গণভোট না হলে দেশে কোনো ভোট হবে না। এ কথা বলে তারা নির্বাচন বন্ধ করার চেষ্টা করছে। বিএনপি দেশের বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল, তাই বিএনপি নির্বাচন করেই ছাড়বে।’
আগামী নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের ভোট বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা। ১২ নভেম্বর রাজধানীর বিওয়াইএলসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ইয়ুথ ম্যাটারস সার্ভে ২০২৫’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে; তরুণদের কাছে কে এগিয়ে- বিএনপি জামায়াত না এনসিপি? এতে দেশের আটটি বিভাগের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ৫০০ তরুণ-তরুণীর মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতা নিবন্ধিত ভোটার এবং ৯৭.২ শতাংশ আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে ইচ্ছুক। এতে দেখা যায়, দেশের তরুণদের ১৯.৬ শতাংশ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দেবে। ১৬.৯ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী এবং ৩.৬ শতাংশ এনসিপিকে সমর্থন করছে। এ ছাড়া ৯.৫ শতাংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পছন্দ করে। ৩০ ভাগ তরুণ এখনও সিদ্ধান্তহীন। ১৭.৭ শতাংশ তরুণ পছন্দের দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তরুণ প্রজন্মের ভাবনা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্ক্ষা বোঝার লক্ষ্যে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলগুলোর মধ্যে মতবিভেদ থাকলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু বিষয়ে সবাইকেই ছাড় দেওয়া উচিত। তা নাহলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তা বিশ্বাসঘাতকতা হবে। তারা মনে করছেন, জনগণ দ্রুত নির্বাচন চায়। তারা শঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা ও আশাহীনতার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে। তারা আশা করছে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় ফেরার।
দলগুলো যদি এখন নির্বাচনে যাবো না, নির্বাচন করবো না, নির্বাচন হতে দেবো না- এমন অবস্থানে যায়, তাহলে তা মানুষের জন্য চরম হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে যা ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে কোনোভাবেই কাম্য না। দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সমঝোতার পথে এগিয়ে আসতে হবে।
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]
