বাসায় ঢুকেছিল কাজ নিতে, বের হলো খুনি হয়ে

[১] [২] [৩]

[৪]

দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক : [৫]দিনে দিনে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে পড়ছে আমাদের রাজধানীর জীবন, আমাদের নিরাপত্তা। অথচ এই যাদুর শহরে প্রতিটি কর্মজীবী পরিবারকে কী পরিমাণ কষ্ট, সারাটা দিন কতটা যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হচ্ছে; সেই বাস্তবতা এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বুড়িগঙ্গার পাড়ের এই শহরে বাসা ভাড়া করে থাকা নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত প্রতিটি পরিবারের গল্প প্রায় একই রকম।

উচ্চবিত্তদের জীবনধারা কিছুটা আলাদা। সেখানেও নানা টেনশন থাকলেও অন্তত লাইফ স্টাইলের আভিজাত্য উপভোগ্য করে তোলে জীবন। কিন্তু কিছু বিষয়ে নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত; সকলের ক্ষেত্রে একই। কোন তারতম্য নেই। আর সেটি হলো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঝুঁকি। ঘরে হোক, কিংবা বাইরে।

বলছিলাম ঢাকার মোহাম্মদপুরে গৃহপরিচারিকা কর্তৃক মা ও মেয়ের নৃশংস খুন হবার ঘটনা। নানাদিক বিশ্লেষণ করে মনে হয়েছে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি নিয়ে আমাদের বারবার ভাবতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে। এবং যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত, রেফারেন্স এবং লিংক ছাড়া কাউকে হুট করে বিশ্বাস করা যাবে না। বাসায় খণ্ডকালীন কাজের লোক দরকার বলেই গেটের কাছে কাজ খুঁজতে আসা অপরিচিত একটি মেয়েকে আমার বাসায় কাজের জন্য প্রবেশ করতে দেব— এমন বোকামির এতবড় প্রায়শ্চিত্ত কি কখনো আমাদের ভাবনায় ছিল! মাত্র ৪ দিনে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বেরিয়ে গেল অচেনা এক আয়েশা।

গৃহপরিচারিকা, ড্রাইভার, সিকিউরিটি গার্ড, কেয়ারটেকারসহ এ ধরনের পেশায় নিযুক্তদের জন্য সরকারের উচিত হবে কিছু নিয়ম-নীতির আওতায় নিয়ে আসা। ন্যূনতম কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালনে বাধ্য করানো। বিশেষ করে গৃহপরিচারিকা রাখার ক্ষেত্রে পরিচয় নিশ্চিত করা, স্থানীয় থানায় জানানো এবং এর পাশাপাশি গৃহপরিচারিকার নিরাপত্তার বিষয়টিও রাষ্ট্রকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। এবং ডিজিটাল এই যুগে খুব সহজভাবেই এটা করা সম্ভব।

পত্রপত্রিকার খবর মতে এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এখনও উদঘাটন করা যায়নি। কোথাও কোথাও পুলিশের বরাত দিয়ে খুনি অর্থাৎ ওই গৃহপরিচারিকা প্রশিক্ষিত বলে দাবি করা হচ্ছে।

হতে পারে প্রশিক্ষত এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে নিহত মেয়ের স্কুল ড্রেস পড়ে সে যেভাবে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেছে, তাতে করে ধারণা করা যায় পরিকল্পনা অনুযায়ী সে প্রশিক্ষত এবং সফল হয়েছে। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ বলতে তাকে আমরা পেশাদার খুনি হিসেবে বলতে পারি না। কেননা পেশাদার খুনির লক্ষ্য থাকে কম আঘাত, ভাইটাল পয়েন্ট এবং দ্রুত হত্যা। নিহত লায়লা আফরোজের (৪৮) দেহে প্রায় ৩০টি এবং তার ১৫ বছর বয়সী মেয়ে নাফিসার দেহে অন্তত ৬টি ছুরিকাঘাত ছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর মতে বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে মেঝেতে। দেয়ালে আছে রক্তের দাগ এবং আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় দেখা গেছে। এ থেকে তাদের ধারণা যে বাসা থেকে কিছু খোয়া যেতে পারে। তবে কী কী খোয়া গেছে, তা জানাতে পারেনি পুলিশ।

তারমানে ঘটনাটি কি এমন হতে পারে যে, চুরি করতে গিয়ে ধরা, মেন্টাল ব্রেক ডাউন এবং থিফ টার্নড কিলার! তবে পারিপার্শ্বিক নানা কিছু মিলিয়ে অনুমান করা যায় ঘটনার সময় খুনি অত্যধিক মানসিক উত্তেজনা বা নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করছিল, যেটাকে বলা হয় ‘ফ্রেনজি মোড’— মনোবৈকল্য, রাগ বা আতঙ্কের কারণে স্বাভাবিক বিবেক হারিয়ে অত্যধিক হিংসাত্মক আচরণ করার ক্ষেত্রে এটি বোঝানো হয়। লায়লা আফরোজের শরীরে ৩০টি আঘাত এবং পত্রপত্রিকার খবর মতে অধিকাংশ গলায় ও মুখে।

আবার এটাকে ‘অপপরচুনিস্টিক কিলিং’ তথা সুযোগ বুঝে হত্যা বলা যাচ্ছে না। কারণ ওই মেয়ের সাথে পরিবারের বা কারোর সাথে শত্রুতা ছিল কি না, তা প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যাচ্ছে না!

এদিকে সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী আয়েশা নামের ওই গৃহকর্মী সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরকা পরে ফ্ল্যাটে ঢোকে এবং ৯টা ৩৬ মিনিটে স্কুলড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। এবং ওই বাসার টয়লেটে থাকা একটি বালতির ভেতরে দুটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকারী ঘটনার পর বাসার টয়লেটে ঢুকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়; এমন আলামত পাওয়া গেছে।

এতটুকু তথ্যের ওপর ঘটনাটি যদি আমরা নানাভাবে বিশ্লেষণ করি তথা ফরেনসিক দৃষ্টিতে ৩০ বার ছুরিকাঘাত সাধারণত ওভারকিল হিসাবে ধরা হয়। এটা সাধারণত দেখা যায় যখন খুনি শিকারকে নিয়ে রাগ ধরে রেখেছে, অপমানবোধ, ক্ষোভ, ভয়, বা হঠাৎ রাগ করে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। পেশাদাররা কখনোই এত আঘাত দেয় না। আবার লায়লা নামের গৃহিণীর মেয়ের ক্ষেত্রে ৪টি আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানা গেছে। তারমানে মেয়েটি মূল টার্গেট ছিল না; তার ক্ষেত্রে ঘটেছে witness elimination বা প্যানিক কিলিং। পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে দ্বিতীয়জনকে হত্যা করা হয়েছে।

ড্রয়িংরুমে যেখান থেকে মেয়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে, সেখানে ইন্টারকম ফোনের তার ছেঁড়া ছিল। হয়তো পরিস্থিতি দেখে মেয়েটি মাকে বাঁচাতে এবং পরবর্তীতে ফোন করতে গিয়েছিল। তাকেও হত্যা করা হয়। কিন্তু এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ওয়াশরুমে গিয়ে খুনি আয়েশা নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা তথা খুনের আলামত, রক্তের দাগ কোন কিছু যেন গায়ে লেগে না থাকে, সেটি খুবই ঠান্ডা মাথায় করেছে সে। অনেকটা বিদেশি সাইকোলজিকাল থ্রিলার সিনেমার মতো। যেমনটি আমরা কারটিস হ্যানসন পরিচালিত The Hand That Rocks the Cradle সিনেমায় দেখতে পাই। ১৯৯২ সালে আমেরিকায় মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমার গল্পের পুরোটা জুড়েই ছিলেন একজন গৃহপরিচারিকা এবং তার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিশোধ তথা revenge.

এ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন হবার সম্ভবনা খুব একটা উজ্জ্বল না হলেও হত্যার ধরনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে মা লায়লা আফরোজকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা ওই ধরনের নিষ্ঠুরতার ইঙ্গিত দেয়। তবে মোটিভ যেটাই হোক, তা অচিরেই পুলিশ খুঁজে বের করতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা যায়।

আমরা যদি ফোরেনসিক মনোবিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করি, তাহলে বোঝা যাচ্ছে খুনি কার্যত নিজের কাজের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিল। বিষয়টি উত্তেজনা বা ফ্রেনজি মোডের চেয়ে সময়মত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা এবং পরিকল্পনার চিহ্ন বহন করে। বিশেষ করে খণ্ডকালীন কাজ নেয়ার ৪ দিনের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড; যেখানে নানা ধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কোনো পক্ষের আদেশ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই সে গৃহপরিচারিকার ছদ্মবেশ ধারণ করে সেখানে গিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে উদ্ধার হওয়া ছুরি সে সাথে করে এনেছিল, নাকি ওই বাসায় ব্যবহার করা কোন ছুরি— এই বিষয়টি সঠিকভাবে জানতে পারলে অনেকখানি নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, হত্যাকাণ্ডটি পূর্ব পরিকল্পিত। এবং সেটি হয়ে থাকলে পুলিশকে নিকটজনদের সাথে কথা বলা এবং বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত ও আলামত বিশ্লেষণ করে এগোতে হবে। আর এরমধ্যে খুনি আটক হলে তো ঘটনার অনেককিছুই খোলসা হয়ে যাবে। হত্যার মোটিভ পরিষ্কার হবে।

তবে কেবল ঢাকার মোহাম্মদপুরে এই জোড়া হত্যা নয়, সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশেষ করে খুনোখুনির ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে একদিকে যেমন ভয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে প্রশাসনের তৎপরতা এবং বিচারব্যবস্থা নিয়েও সন্দিহান হতে হচ্ছে বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে।

পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় প্রবাসী পলাশ নামে এক রেমিট্যান্স যোদ্ধার ৭ বছরের শিশু সন্তান জায়ান রহমানকে হত্যা করে গাছে লাশ ঝুলিয়ে দেয় খুনিরা। প্রায় ২০ দিন হয়ে গেল সন্দেহভাজন পলাতক খুনিদের ধরতে পারেনি পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রভাবশালী একটি পরিবার এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। অথচ স্থানীয় থানা পুলিশের ভূমিকা রহস্যাবৃত। আবার পাবনার শালগাড়িয়া সরদারপাড়া মহল্লার একটি বাগান থেকে নয় বছর বয়সী এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। এখনো ওই ঘটনার কোনো কূলকিনারা হয়নি।

দুই দিন আগে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের খিয়ারপাড়া গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) এবং তার স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের (৬০) গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই হত্যার মোটিভ এখনও উদঘাটন হয়নি।

বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনায় সরাসরি আইনশৃঙ্খলার অবনতি হিসাবে দোষারোপ করা না হলেও নিঃসন্দেহে তা প্রশাসনিক দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করে। দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেই এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে সমাজের দুষ্কৃতকারীরা। বিশেষ করে ঘটনার পরবর্তীতে প্রশাসনের তৎপরতা আশাব্যাঞ্জক হচ্ছে না বলেই এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।

পরিশেষে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। অবাধ তথ্যপ্রযুত্তির এই যুগে হাতের মুঠোফোনে আমরা অনেক কিছু করতে পারছি। নিশ্চিত হতে পারছি। সরকার কি এমন কোনো সাইট বা অ্যাপস দিতে পারে না, যেখানে বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ দেওয়ার শুরুতে আমরা নির্দিষ্ট একটি সাইটে প্রবেশ করব— তার নাম, পিতা-মাতার নাম, জেলা, স্থায়ী এবং অস্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করব। তার এনআইডি নম্বর দেয়ার পর চোখের মণির বায়োমেট্রিক এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইকরণের পর সেটি গৃহকর্তা এবং গৃহকর্মীর উভয়ের থানায় অটোমেটিকভাবে চলে যাবে। এতে করে উভয়ের তথ্য সংরক্ষিত থাকার মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে যে কোন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আমাদের অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হবে না।

সুজায়েত শামীম সুমন: অপরাধ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 (জনতারদেশ/রুপমআহমেদ// )

খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]

ইউটিউব চ্যানেল SUBSCRIBE করতে ক্লিক করুন [৭]

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করবেন [৫]

[১] [২] [৩]