দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক : [৫]রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণ কথার ফুলঝুরি পছন্দ করে না; বরং তাদের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা হবে, তার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দেখতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বিএনপির ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মসূচির তৃতীয় দিনের সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণ আমাদের কাছে কথার ফুলঝুরি পছন্দ করে না। জনগণ আমাদের কাছে প্রত্যাশা করে, কীভাবে আমরা দেশকে পরিচালনা করব, তাদের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করব। পুরো পরিকল্পনা জনগণ আমাদের কাছে দেখতে চায়। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ডিটেইল প্ল্যানিং শুধু বিএনপির আছে, আর কোনো দলের নয়।
তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিএনপির কাছেই নিরাপদ। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, দেশ এবং জনগণকে পক্ষে নিতে না পারলে দেশের অস্তিত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন দেখা দেবে। বিভাজন ও বিভক্তি রেখে দেশ গড়া সম্ভব নয়।
অনেকেই নানা বক্তব্য দিলেও ক্ষমতায় গেলে দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিএনপির মতো বিস্তারিত কেউ তুলে ধরেনি বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি জানান, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে চার কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে এবং রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, যেকোনো মূল্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তিনি বলেন, দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, আইনের মাধ্যমেই বিচার করা হবে। দুর্নীতি দমনে বিএনপি বড় ভূমিকা রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকার গঠনে সক্ষম হলে স্বাবলম্বী মা ও স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তোলার লক্ষ্য থাকবে বলে জানান।
তিনি বলেন, সরকার গঠন করতে পারলে সরকারের কোনো দুর্নীতির তদন্তে অনুমতি নেওয়ার বিধান বাতিল করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না বিএনপি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতি কীভাবে বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে—তা বুঝতে দূরে যাওয়ার দরকার নেই। মেধার ভিত্তিতে চাকরি খুঁজতে বের হওয়া একজন গ্র্যাজুয়েট, মাসের পর মাস ধরে একটি সাধারণ সরকারি সেবা পেতে হিমশিম খাওয়া কৃষক, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তরুণের পরিবারের দুর্ভোগ বা ব্যবসা বাঁচাতে ঘুষ দিতে বাধ্য উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাই বাস্তবতার চিত্র দেখায়। খাবারের দাম কেন বাড়ে, স্কুলে ভালো পড়াশোনা কেন মেলে না, রাস্তায় কেন নিরাপত্তা নেই, সব কিছুর পেছনে সেই একই কারণ- দুর্নীতি। এটা লাখো মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে দমবন্ধ করে ফেলেছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস আমাদের সেই লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, আর মনে করিয়ে দেয় সেই সময়টাও, যখন বাংলাদেশ সত্যিকারের অগ্রগতি করেছিল। আর সেই সময়টা এসেছে মূলত বিএনপির আমলে।
বিএনপির অতীতে নেওয়া বড় পদক্ষেপগুলোর মধ্যে তারেক রহমান উল্লেখ করেন- শক্তিশালী অর্থ ব্যবস্থাপনা ও মানি লন্ডারিংবিরোধী আইন; প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রভিত্তিক স্বচ্ছ ক্রয় নীতি; টেলিকম, মিডিয়া, বিমান পরিবহনসহ উন্মুক্ত বাজারনীতি; প্রশাসনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জিয়াউর রহমান প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো, পরিচ্ছন্ন সরকারি সেবা আর অর্থনীতিকে মুক্ত করার কাজে হাত দিয়েছিলেন, যা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিল। তারপর বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আধুনিকায়ন শুরু হয়; নতুন ক্রয় নীতিমালা, কঠোর আর্থিক আইন, শক্তিশালী অডিট ব্যবস্থা, আর পরিষ্কার নজরদারি।
তিনি আরও বলেন, টিআইবির জরিপেও দেখা গেছে- ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। মানুষ নিজেরাই বলেছে- দুর্নীতি কমেছে। এটা কোনো গল্প নয়, এটা তখনকার সংস্কারের প্রমাণ।
তারেক রহমান দাবি করেন, ‘দুর্নীতি কমানোর ধারাবাহিক রেকর্ড একমাত্র বিএনপিরই আছে।’ তিনি আগামীদিনের দুর্নীতি দমন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে- আদালত, দুদক, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি সেবায় পূর্ণ স্বাধীনতা; উন্মুক্ত দরপত্র, সম্পদ বিবরণী ও রিয়েল-টাইম অডিট; আধুনিক পুলিশিং ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থা; সব লাইসেন্স-জমি-পেমেন্ট অনলাইনে এনে ঘুষের অবসান; হুইসলব্লোয়ারদের পূর্ণ সুরক্ষা; শিক্ষা ব্যবস্থায় সততা ও নৈতিকতা পাঠ; ডিজিটাল ব্যয় নজরদারিতে শক্তিশালী আর্থিক পর্যবেক্ষণ।
তিনি বলেন, বহু বছর অব্যবস্থাপনার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অবশ্যই কঠিন হবে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসই প্রমাণ করে, যখন সৎ নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের সমর্থন একসঙ্গে আসে, তখন পরিবর্তন অসম্ভব নয়। জনগণ যদি দায়িত্ব দেয়, বিএনপি আবারও সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
শিক্ষা বিষয়ে তিনি জানান, স্কুল পর্যায়ে একাধিক ভাষা বাধ্যতামূলক করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভাষা নির্বাচন করতে পারবে। ইংরেজির পাশাপাশি আরও একটি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে।
তরুণদের বিষয়ে তিনি বলেন, “ভোকেশনাল শিক্ষার কিছু বিষয়ও বাধ্যতামূলক করা হবে। এভাবে একজন শিশুকে ছোট বয়স থেকে স্বাধীন ও সক্ষম করে গড়ে তোলা হবে। আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউশন চালু করার। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাষা শিক্ষা দেওয়া হবে।”
ধর্মীয় অবকাঠামো ও সমাজকল্যাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখের মতো মসজিদ আছে। মসজিদগুলোতে যে ইমাম-মুয়াজ্জিন সাহেবরা আছেন, তাদের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]
