মোবাইল-নেশা থেকে শিশুদের ‘মুখ ফেরানোর চেষ্টা’ লাল মিয়ার
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন :বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। সাত-সকালেই যে যার মতো ছুটে যান কর্মস্থলে। তার আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া তাদের একমাত্র সন্তানকে পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে তুলে দেন তারা।
যেন দায়িত্বপ্রাপ্ত সেই সদস্যটি শিশুটিকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া ও নিয়ে আসার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এতে সন্তানের বিষয়ে বাবা-মায়ের এক ধরনের নিশ্চিন্ততা কাজ করে।
প্রাথমিকে পড়া শিশুটি স্কুল থেকে ফিরে একাকিত্ব কাটাতে বেছে নেয় আধুনিক মোবাইল ফোন। যেখানে রয়েছে রাশি রাশি গেমের সাম্রাজ্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা হয়ে শিশুটি টিভির কার্টুনের বদলে মোবাইল গেমেই বেশি সময় কাটায়।
ঘরে ঘরে মোবাইল গেমে আসক্ত শিশুদের নিয়ে বাবা-মা ও অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এই আসক্তির যেন কোনো শেষ নেই, শুধু শুরুই আছে।
এমন শিশুদের জন্যই ছোট্ট একটি উদ্যোগ নিয়ে নিজের মতো করে ফেরি করে বেড়াচ্ছেন বয়োজ্যেষ্ঠ লাল মিয়া।
সম্প্রতি এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে লাল মিয়ার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
কেউ কেউ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার পণ্যসামগ্রীর দিকে তাকিয়ে থাকেন, আবার কেউ আগ্রহ নিয়ে কাছে এসে দেখেন। শিশুদের প্রতি লাল মিয়ার এই উদ্যোগ সফল হলে কিছুটা হলেও কমবে তাদের মোবাইল আসক্তি।
তাহলে কী এই উদ্যোগ? তার প্রচেষ্টা হলো, মোবাইলে আসক্ত শিশুদের কিছু সময়ের জন্য হলেও মোবাইল থেকে মুখ ফেরানো। বিশেষ এক ধরনের খেলনার মাধ্যমে এই চেষ্টা করা হচ্ছে। খেলনাটি খেলতে খেলতে শিশুরা দূরে থাকতে পারে মোবাইল গেম থেকে।
বৃত্তাকার এই খেলনার ভেতর বারবার ঘুরে শিশুদের চোখ। তারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে খেলনাটির দিকে। খেলনার ভেতর দিয়ে ফুটে ওঠে লাল, নীল ও সবুজ রঙের বৃত্তাকার নকশা।
বিভিন্ন আকার ও রঙের এই রেখাময় সৌন্দর্য শুধু শিশুদের নয়, বড়দেরও আকর্ষণ করে। তাই ফুটপাতের ছোট্ট এই দোকানে বড়দের ভিড়ও দেখা যায়। সবাই জানতে চান, বুঝতে চান, আসলে ব্যাপারটা কী?
সহজ করে বললে, এটি গেম-আসক্ত শিশুদের মোবাইল থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখার একটি প্রচেষ্টা। খেলনাটির নাম ‘শিশুদের রেখা অঙ্কন’। এর মাধ্যমে ফেরিওয়ালা লাল মিয়া ছোট ছোট সোনামণিদের হাতে কলম তুলে দিতে চান।
একসময় দুই সোনামণি এসে ‘শিশুদের রেখা অঙ্কন’ খেলনার ওপর হাত রাখে। বৃত্তাকারের ভেতর কলম ঘুরাতে ঘুরাতে সাদা কাগজে ফুটে ওঠে অপূর্ব সুন্দর রঙিন বৃত্ত। খুশিতে ভরে ওঠে তাদের মন। পরে তারা একশ টাকা দিয়ে দুটি পণ্য কিনে নেয়।
‘শিশুদের রেখা অঙ্কন’ পণ্যের বিক্রেতা লাল মিয়া বলেন, “আমি ছোটদের জন্য রেখা অঙ্কনের একটি পণ্য বিক্রি করি। এতে বাচ্চারা বিনোদন পায়। ছোট ছোট বাবুদের হাতে কলম তুলে দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। কারণ, এখনকার বাচ্চারা মোবাইলে আসক্ত। প্রায় সব ঘরের বাচ্চাদের একই অবস্থা। তারা মোবাইল ছাড়া কিছু বোঝে না। আমার এই পণ্যের মাধ্যমে আমরা তাদের কিছু সময়ের জন্য হলেও মোবাইল থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করি।”
তিনি আরও বলেন, এই পণ্যের দাম খুবই সামান্য, মাত্র ৫০ টাকা। বাচ্চাদের হাতে এই প্যাকেটটা দিন, সঙ্গে দুটি কলম দিন। দেখবেন, তারা কলম নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। এতে তাদের হাতের লেখাও সুন্দর হবে। আমরা বাচ্চাদের হাতে দামি দামি খেলনা দিয়েছি, কিন্তু খেলনা তো খেলনাই। আর এটা শিক্ষণীয়। খেলতেও পারবে, শিখতেও পারবে, দুটোই একসঙ্গে।
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন





