দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক : [৫]মূল সমস্যাটি চিকিৎসার নয়, আস্থার। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান- ভারত, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডে। অনেকের ধারণা, বিদেশে চিকিৎসা বেশি ভালো হয়। সেখানে রিপোর্টে ভুল হয় না।
ডাক্তাররা বেশি সময় দেন, বেশি শোনেন। বাস্তবতা হলো, শুধু উন্নত মেশিন বা হাসপাতালের অভাবে নয়, বরং আস্থা, গুণগত মান ও রোগী-ডাক্তারের মধ্যে ভালো সম্পর্কের অভাবই এটির বড় কারণ। আর এখানেই বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় জাতির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে।
আস্থার অভাব: রোগী যখন হাসপাতালে আসেন, তিনি শুধু ওষুধ চান না।
চান নিরাপত্তা, সম্মান ও সঠিক যত্ন। অনেক সময় তারা মনে করেন, ডাক্তার যথেষ্ট সময় নিচ্ছেন না। রিপোর্ট ভুল হতে পারে। প্রতি ভিজিটে নতুন ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
একটি রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে আরও রোগ ধরা পড়ছে-এই অনিশ্চয়তা রোগীর মনে আস্থাহীনতা তৈরি করে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগের মূল কারণ খুঁজে না পাওয়া: ডায়াবেটিস, হরমোনের সমস্যা বা মেটাবলিক ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধু লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যেমন: শুধু ব্লাড সুগার কমানোর চেষ্টা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সকে উপেক্ষা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপের দিকে না তাকানো। ফলে রোগী মনে করেন, তার আসল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
ডায়াগনস্টিক সেবার মান নিয়ে সংশয়: রোগ নির্ণয় হচ্ছে চিকিৎসার ভিত্তি।
রোগীর মনে হয়- রিপোর্টে ভুল হতে পারে। তাই তিনি এমন জায়গায় যাবেন যেখানে রিপোর্টে তার আস্থা বেশি।
রোগী-ডাক্তার সম্পর্কে দুর্বল যোগাযোগ: বিদেশে রোগীরা প্রায়ই বলেন, ‘ডাক্তার আমার কথা মন দিয়ে শুনেছেন, ছোট ছোট বিষয়ও বুঝিয়ে বলেছেন, আমাকে পরিবারের সদস্যের মতো মনে করেছেন।’ এই মানবিক সম্পর্ক রোগীর মন জয় করে, যা আমাদের ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল।
অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন: অনেক রোগীর ব্যাগে ৫-১০ ধরনের ওষুধ থাকে। তারা ভাবেন, ‘আমি সুস্থ হচ্ছি নাকি শুধু ওষুধ খেয়েই যাচ্ছি?’ এই সংশয়ও তাদের বিদেশমুখী করে।
সমাধান: রোগীকে গুরুত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন। রোগীর কথা শুনতে হবে, তার উদ্বেগ বুঝতে হবে এবং তাকে সময় দিতে হবে। একটি উষ্ণ ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্কই রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনে। ডায়াগনস্টিক সেবার মান উন্নয়ন করতে হবে। দেশের বড় বড় ল্যাবগুলো যদি আন্তর্জাতিকমানের সার্টিফিকেশন পায়, তাহলে রোগীরা দেশেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আস্থাবান হবেন। রোগের মূল কারণভিত্তিক চিকিৎসা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ নয়, বরং জীবনযাপনে পরিবর্তন, হরমোনের ভারসাম্য, মেটাবলিক হেলথ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি ও ঘুমের ব্যবস্থাপনা-এসবের ওপর জোর দিতে হবে। মানবিক ও সহানুভূতিশীল সেবা নিশ্চিত করতে হবে। রোগী শুধু তাঁর রিপোর্ট নয়- স্নেহ, শ্রদ্ধা ও যত্নও খোঁজেন। বিদেশে এটি পাওয়ায় তিনি সেখানে আকর্ষিত হন। প্রযুক্তি ও গুণগত মানে বিনিয়োগ করতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ টেকনিশিয়ান ও নিয়মিত কোয়ালিটি কন্ট্রোল-এই তিনটি থাকলে রোগীরা দেশেই বিশ্বস্ত হবেন।
বাংলাদেশ চাইলে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসার্থী প্রেরণ অর্ধেকেরও বেশি কমাতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন রোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনা, ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসার মান আন্তর্জাতিক স্তরে নেওয়া, রোগের মূল কারণ খুঁজে বের করে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেওয়া। যেদিন রোগী বুঝবেন- ‘আমার ডাক্তার আমাকে বুঝছেন, আমার মূল সমস্যাটি ধরতে পারছেন’-সেদিনই তিনি আর বিদেশে যাবেন না।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার বিশ্বাস, মানুষ শুধু চিকিৎসার অভাবে বিদেশে যান না- যান আস্থা, নিশ্চয়তা ও মানবিকতার অভাবেই। আর এই তিনটি জিনিসই আমরা আমাদের সচেতনতা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারি। স্বাস্থ্যসেবায় যখন আস্থা ফিরে আসবে, তখন বাংলাদেশই হবে চিকিৎসার আদর্শ গন্তব্য।
লেখক: ডায়াবেটোলজিস্ট ও অ্যান্ডোক্রাইনোলজিস্ট
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন [৬]
