না জেনে মন্তব্য করা গর্হিত অপরাধ…
✍️ শেখ খালিদ সাইফুল্লাহ:আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যাতে লোকেদের না জেনে কথা বলার প্রবণতাটাই বেশি। সমাজে কোন কিছু ঘটলে বা কারো বিরুদ্ধে কোনো কথা উঠলে এক শ্রেণীর মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে সত্যতা যাচাই পূর্বক বেফাঁস মন্তব্য করতে থাকে,অভিযোগ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে সাফাই গাইতে থাকে।
এ কু-অভ্যাসটি পেন্ট-শার্ট পরনেওলা থেকে শুরু করে পাঞ্জাবি টুপি ও পাগড়ি ওয়ালা,পথের টোকাই থেকে নিয়ে পাক্কা হাজী সাহেব পর্যন্ত কাউকে ছাড় দেয়নি।
আশ্চর্য হই, যখন দেখি- মুখভরা দাঁড়ি, মাথায় টুপি পরনে লম্বা পাঞ্জাবি কথিত আলেম,হাফেজ অথবা ইমাম সেজে প্রতিনিয়ত না জেনে মন্তব্য করে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। আর ওদের কথাই বাদ দিলাম,যাদের চেহারা চরিত্র ও বেশভুষেই ফোঁটে উঠে সে একদম পাক্কা ফাসেক একজন মুনাফিক ওদের ধর্মটাও তাই।তাদের কাজই হলো অপরের দোষ চর্চা করা, দুইজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাঁধিয়ে রাখা,বাস্তবতা না জেনে কথা বলা, মিথ্যাকে সাজিয়ে বলা সর্বোপরী সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানো। বাজার অফিস আদালত থেকে শুরু করে মন্দির গির্জা এমনকি মসজিদ মাদ্রাসা সর্বত্রই এদের উপদ্রব বেড়িয়ে চলেছে। এদের আলাদা কোন ধর্ম নেই আলাদা কোন পরিচয় নেই। ওদের পরিচয় একটাই ওরা ফাত্তান বা ফিতনাবাজ ।
তাদের এসব কথা দ্বারা সমাজের কতই না ক্ষতি হচ্ছে,নতুন নতুন অপরাধের উদ্ভট হচ্ছে,সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢাকার অপপ্রয়াস বেড়েই চলেছে। সত্যের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ সন্দেহে পতিত হচ্ছে। তাছাড়া অপরাধীর পক্ষাবলম্বনে দোষীকে আরো হঠকারী বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। কারণ সে এরই মাধ্যমে দুনিয়াবি শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যায় এবং অপরাধ করেও সমাজে স্বাধীন ভাবে বিচরণ করতে পারে অতঃপর আরো অপরাধ কর্ম ঘটিয়ে যেতে কোনো দ্বিধা করে না। এতে নিজেরা আল্লাহর দরবারে কতই না বড় অপরাধী হয়েছে? তারা কি কখনো ভেবে দেখেছে?
কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না জেনে ওই বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কোনো কথা বলা অপরাধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, হৃদয়—এসবের ব্যাপারে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে।’(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘ধ্বংস হোক অনুমানকারীরা(মিথ্যাচারীরা)’ (সুরা : জারিয়াত,আয়াত : ১০)
না জেনে কথা বলা একধরনের মিথ্যাচার। অথচ মিথ্যা বলা অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া গর্হিত অপরাধ।মিথ্যা কখনো কখনো মিথ্যাবাদীকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছে দেয় এবং মিথ্যা বলতে বলতে পরিশেষে সে আল্লাহ তাআলার কাছে মিথ্যুক হিসেবে পরিগণিত হয়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (সত্যতা যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়(মুসলিম)।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. বলেছেনঃ সততা সৎকর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে আর সৎকর্ম জান্নাতের পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোন মানুষ সত্য কথা বলায় সত্যবাদী হিসেবে (তার নাম) লিপিবদ্ধ হয়। আর অসত্য পাপের পথপ্রদর্শন করে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পথপ্রদর্শন করে। নিশ্চয়ই কোন ব্যক্তি মিথ্যায় রত থাকলে পরিশেষে মিথ্যাবাদী হিসেবেই (তার নাম) লিপিবদ্ধ করা হয়। (মুসলিম, হাদিস : ৬৫৩১-৩৩)
অতএব,অজান্তে নিজেদের কথাগুলো প্রকাশ করাটা খারাপ মন্তব্যে পরিণত হয়ে যায়। ওই অপরাধগুলো শুধু নিজেদের জন্য অমঙ্গল তা নয়; বরং যার বিরুদ্ধে বলে থাকি তার জীবনেও সমস্যার জন্ম নেয়।অনেক বিশ্বস্ত মানুষ তাকে ভুল বুঝে থাকে,তার প্রতি খারাপ ধারণার জন্ম নেয় এবং অপবাদের ফলে সে নিজেও অশান্তি ও অস্বস্তি ভোগ করে থাকে। তাছাড়া অনুমানভিত্তিক কথা দিয়ে কখনো বিচারককে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার ব্যাপারে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা হয়। এতে ন্যায় বিচারকের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।আর এর মাধ্যমে বিবাদীর ওপর বিশেষভাবে জুলুম করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অতিরিক্ত অনুমান থেকে দূরে থাক। কারণ অনেক অনুমান পাপ বয়ে আনে।’ (সুরা হুজরাত : ১২)
প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো,তারা কখনো মিথ্যা বলে না আর না জেনে কোন বিষয়ে মন্তব্য করে না।
তবে মনে রাখতে হবে- একজন মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিলে শুধু সেই অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে তা নয়; বরং ওই তথ্যের ওপর যে ব্যক্তিই সহমত প্রকাশ করবে সেও সমান অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে। অতএব আমাদের উচিতন যথাসম্ভব নিজেদের জবানকে সংযত রাখা এবং না জেনে অহেতুক মন্তব্য করা ও অশালীন কথাবার্তা থেকে নিজেদের বিরত রাখা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ভয়ঙ্কর পাপ থেকে হেফাজত করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামিন,
লেখক:
সিনিয়র শিক্ষক;
ঢাকাদক্ষিণ দারুল উলুম হুসাইনিয়া মাদ্রাসা,সিলেট।



