ভোটার তালিকার বাইরে জলবায়ু উদ্বাস্তুরা
দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক :৬৫ বছর বয়সী জাহানারা বেগমের জীবনে ভোট একটি অধরা বিষয়। জন্ম বরিশালের ইলশা বাড়ি এলাকায়। প্রায় তিন দশক আগে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসেন তিনি। ভিটেমাটি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারান ভোটাধিকারও।
জলবায়ু দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি জাহানারা।
“বাড়ি নদীতে গেছে। তখন থেকেই ভোট দিতে পারি না। কাগজ নাই, ঠিকানা নাই সব জায়গায় ঘুরেও কিছু হয় নাই,” বলেন তিনি।
ঢাকায় এসে মিরপুরের একটি বস্তিতে ঠাঁই হয় জাহানারার। একসময় চা বিক্রি করে সংসার চালালেও বয়সের ভার আর নানা শারীরিক অসুস্থতায় এখন সেটিও আর পারেন না। তবুও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আশায় তিনি একাধিকবার ওয়ার্ড কমিশন থেকে শুরু করে নির্বাচন অফিসে গেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে ফিরতে হয়েছে, কারণ স্থায়ী ঠিকানার কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি।
ফলে এবারও ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি তার।
ভোটাধিকার হারানো মানে শুধু ব্যালটে সিল মারা নয়, জাহানারার ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর। “ভোট দিতে পারি না, আবার বয়স্ক ভাতাও পাই না। বিধবা ভাতাও পাই না। তাহলে আমি কি এই দেশের নাগরিক না?” প্রশ্ন তার।
জাহানারা একা নন। জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঢাকায় আসা হাজারো মানুষের বাস্তবতা প্রায় একই। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বরিশালের ভোলা থেকে ঢাকায় আসেন অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন। তার ভোটার আইডি কার্ড আছে, কিন্তু ঠিকানা জটিলতায় তিনি এখন ভোট দিতে পারছেন না। গ্রামে আর যাওয়া হয় না। ঢাকায় ভোটার হিসেবে স্থানান্তরও সম্ভব হয়নি।
এর প্রভাব পড়েছে তার পরিবারের ওপরও। ঠিকানা জটিলতার কারণে তার দুই সন্তানের জন্মনিবন্ধন আজও হয়নি। সন্তানদের জন্ম বরগুনা জেলায়, আর বর্তমানে বসবাস ঢাকায় দুই জায়গার কাগজপত্রের জটিলতায় আটকে আছে পুরো পরিবার। ভোটার আইডি সংশোধন বা নতুন করে ভোটার হতে গিয়ে অনেকেই পড়ছেন দালালচক্রের ফাঁদে।
জাহানারা বলেন, “নির্বাচন অফিসে গেলে দালালরা বলে তিন হাজার টাকা দিলে এনআইডি করে দেবে। এত টাকা আমি কোথা থেকে দেব?”
এই সংকট শুধু মধ্যবয়সী বা বয়স্কদের নয়, ছুঁয়ে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মকেও। ভিটেমাটি হারিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় আসা তরুণী মিতু আক্তার পড়াশোনা করেছেন ক্লাস পাঁচ পর্যন্ত। বয়স হয়েছে ভোট দেওয়ার, কিন্তু এখনো ভোটার হতে পারেননি। ভোটার আইডি না থাকায় এবারের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
এই ব্যক্তিগত গল্পগুলোর পেছনে রয়েছে একটি বড় কাঠামোগত বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি)-এর গ্লোবাল ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু ২০২২ সালেই বাংলাদেশে দুর্যোগজনিত কারণে প্রায় ৭০ লাখের কাছাকাছি মানুষ নতুন করে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়, যা বিশ্বে দুর্যোগজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির অন্যতম উচ্চ হার। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
তবে এই বিপুল সংখ্যক অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য এখনো নেই কোনো সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ডাটাবেজ। ফলে কারা কোথা থেকে এসেছে, কোথায় বসবাস করছে, তাদের নাগরিক অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর নেই।
মাঠপর্যায়ে কাজ করা এনজিওগুলোও এই জটিলতার কথা বলছে। সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনোমিক ইনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপি) এনজিওর অপারেশন ম্যানেজার ফারজানা আলম বলেন, “আমরা মাঠ পর্যায় থেকে ঢাকায় আসা ক্লাইমেট মাইগ্রেটদের ভোটার আইডি করানোর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছি। নির্বাচনে এত মানুষ ভোট দিতে পারছে না এটা রাষ্ট্রের জন্য ভালো বার্তা নয়।”
গবেষকরা বলছেন, সমস্যার মূল রয়েছে ডাটা ও নীতিগত স্বীকৃতির অভাবে। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি)-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামছুদ্দোহা বলেন, “প্রতিবছর কত মানুষ ক্লাইমেট মাইগ্রেশনের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, এর সঠিক কোনো ডাটা নেই। ডাটা ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশনের অভাবে তারা নিজের দেশেই কার্যত উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বস্তিবাসীদের রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন সময় ব্যবহার করা হলেও অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে সবাই দায়িত্বহীন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের স্বার্থে ক্লাইমেট মাইগ্রেশন ইস্যুটি এড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে বারবার বলা হলেও এটি বড় রাজনৈতিক এজেন্ডা হয়ে উঠছে না।”
বর্তমানে প্রবাসী ভোটার কিংবা কারাবন্দীদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি থাকলেও জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য নেই কোনো বিশেষ ভোটার বা এনআইডি ক্যাটাগরি। এনআইডি বিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ন কবির বলেন, “বিষয়টি আমরা আমলে নিচ্ছি। কাগজপত্রের জটিলতা তেমন নেই। কেউ যদি বস্তিতে থাকেন, তাহলে বাড়িওয়ালার স্থায়ী ঠিকানা দিলেই এনআইডি করা সম্ভব।”
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, কাগজের নিয়ম আর জীবনের বাস্তবতার ফাঁকেই ভোটাধিকার হারাচ্ছেন জাহানারা বেগমের মতো হাজারো জলবায়ু উদ্বাস্তু। প্রশ্ন থেকে যায় ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষ কি কেবল ভোটের সময় প্রয়োজন, নাকি নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়ও রাষ্ট্র নেবে?
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন






