নির্বাচনে খুলনা বিভাগে বিএনপির বিপর্যয়ের কারণ
দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক :ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে বিজয়ী হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বড় জয় পাওয়ায় বিভাগটিতে কার্যত ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে দলটি। তবে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থীরা এই বিভাগে জয় পেয়েছে মাত্র ১১টি আসনে।
জেলা অনুযায়ী আসনসংখ্যা: বাগেরহাটে ৪টি, চুয়াডাঙ্গায় ২টি, যশোরে ৬টি, ঝিনাইদহে ৪টি, খুলনায় ৬টি, কুষ্টিয়ায় ৪টি, মাগুরায় ২টি, মেহেরপুরে ২টি, নড়াইলে ২টি, সাতক্ষীরায় ৪টি আসন।
জামায়াতের জয়ী হওয়া ২৫টি আসনের মধ্যে খুলনা জেলায় ২টি, বাগেরহাটে ৩টি, সাতক্ষীরায় ৪টি, যশোরে ৫টি, চুয়াডাঙ্গায় ২টি, মেহেরপুরে ২টি, কুষ্টিয়ায় ৩টি, ঝিনাইদহে ৩টি, নড়াইলে ১টি আসন রয়েছে।
খুলনা বিভাগে জামায়াতের জয় ও বিএনপির পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করেছে খুলনা বিভাগের বাংলানিউজের করেসপন্ডেন্টরা।
খুলনা জেলা
খুলনা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। দল তাকে মনোনয়ন দিলেও পদে না ফেরানোর কারণে সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম বিএনপির দুর্গ খুলনা-২ আসনে হানা দিয়েছে জামায়াত। অনৈক্য ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে তার পরাজয় হয়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয় নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
তবে ভিন্ন চিত্র খুলনা-৫ আসনে। সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী আলী আসগর লবি হারিয়েছেন হাইপ্রোফাইল প্রার্থী জামায়াত ইসলামের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারকে।
বিএনপির কমিটি না থাকলেও সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ার কারণে বিজয়ী হতে পেরেছেন লবি।
কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনটি জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতির মাঠে থাকলেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এ আসনে বিএনপি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দিতে না পারায় সহজেই জিতে গেছে জামায়াত। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মনিরুল হাসান বাপ্পী এ আসনে প্রার্থী হলেও তিনি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা নন।
যার কারণে স্থানীয় বিএনপির অনেকেই তাকে গ্রহণ করেননি।
বাগেরহাট জেলা
নির্বাচনে জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে বাগেরহাট-১, ২ ও ৪ এই তিনটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। আর বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী জয় পেয়েছেন।
জামায়াতের বিজয়ী প্রার্থীরা হলেন:
• বাগেরহাট-১: মাওলানা মশিউর রহমান খান
• বাগেরহাট-২: শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ
• বাগেরহাট-৪: মোঃ আব্দুল আলীম
বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী:
• বাগেরহাট-৩: শেখ ফরিদুল ইসলাম
এবারই প্রথম বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীরা বিজয় লাভ করেছেন। বাগেরহাট-১ ও ২ আসনে প্রথমবারের মতো জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। তিনটি আসনে বিজয়ের কারণ হিসেবে বিএনপির নতুন ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীর বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর মধ্যে বাগেরহাট-১ বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মন্ডল এবং বাগেরহাট-৪ আসনে বিএনপির সোমনাথ দে দলে যোগ দিয়েই মনোনয়ন পেয়েছেন। দুজনই আগে আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। তেমনি হিন্দু ধর্মালম্বী নেতাও ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ ছিল। এর ফলে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই নেতাকর্মীরা তাদের ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। এমনকি দুই আসনে বিক্ষোভও হয়েছে।
অন্যদিকে বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মাদ জাকির হোসেন জেলার রাজনীতিতে ২০২৪ সালের আগস্টের আগে তেমন সক্রিয় ছিলেন না। মাঠ পর্যায়ে তার পরিচিতি অনেক কম। এছাড়া এই তিনটি আসনেই বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।
বাগেরহাট-১ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএএইচ সেলিম ও জেলা বিএনপির সদস্য মাসুদ রানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থীর পরাজয়ের পিছনে এই দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীকেও দায়ী করেছেন অনেকে।
এছাড়া বাগেরহাট-২ আসনেও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএএইচ সেলিম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। এমএএইচ সেলিমের ছোট ভাই জেলা বিএনপির সমন্বয়ক ও সাবেক সভাপতি এমএ সালাম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এমএএইচ সেলিমের নির্বাচন করা এবং ভোটের মাঠে ধানের শীষের পক্ষে এমএ সালামের নিষ্ক্রিয় থাকার কারণে বিএনপির পরাজয় হয়েছে।
অন্যদিকে বাগেরহাট-৪ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য কাজী খায়রুজ্জামান শিপন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। বিভিন্ন স্থানে তিনি বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করেছেন। দলের মধ্যে শিপনের অনুসারীরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেননি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেলা জুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, সাধারণ মানুষকে মারধর, ঘের দখল এবং নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিরোধ চরম পর্যায়ে ছিল। এসব কারণে পুরো জেলা জুড়ে ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
সাতক্ষীরা জেলা
সাতক্ষীরা-১ আসনে ৫ আগস্টের পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ ছিল। যা বিএনপি প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া নিজ উপজেলা কলারোয়ায় দলীয় গ্রুপিংও প্রকট। কলারোয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্তারুল ইসলামের সঙ্গে তার দূরত্ব রয়েছে। সবশেষে হাত মেলালেও তাকে হাবিবুল ইসলাম হাবিবের পক্ষে মাঠে নামতে দেখা যায়নি।
সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুর রউফ স্থানীয় আলিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হলেও তিনি সাতক্ষীরার গডফাদার রউফ-সবুর পরিবারের অন্যতম অধিপতি। তিনি স্কুলে যাননি এবং লেখা-পড়া করতে পারেন না। মানুষের সঙ্গে তার আচরণ চরমভাবে দুর্ব্যবহারমূলক। এছাড়া তার ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরার হাজারো বিঘা খাসজমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও মনোনয়ন পান, যা স্থানীয় বিএনপিতে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করেছে।
এসব কারণে নির্বাচনের ফল দাঁড়িয়েছে —
সাতক্ষীরা-১: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ
সাতক্ষীরা-২: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক
সাতক্ষীরা-৩: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার
সাতক্ষীরা-৪: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জি. এম. নজরুল ইসলাম
যশোর জেলা
যশোরে জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর কাছে পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলাকে দুষছেন দলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী পরিকল্পিতভাবে এগিয়েছে। তারা ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে জেলার সকল আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর থেকে জেলার আট উপজেলায় বিএনপির মধ্যে এই বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকার সময় দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় একের পর এক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকে দল থেকে বরখাস্ত করা হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়নি। তার ওপর ছিল ভুল প্রার্থী মনোনয়ন।
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি আসনে একাধিক নেতা দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে ওঠেন। দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার আগে এসব নেতা ধানের শীষ যাকে দেওয়া হবে তার পক্ষে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও যশোর-৩ আসন ছাড়া আর কোনো আসনে তা দেখা যায়নি।
দলের নেতারা বলেন, যশোর-১ (শার্শা) আসনে প্রথমে মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে ধানের শীষের মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে সরিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় দলের শার্শা উপজেলা সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে। এরপর থেকেই ভোটের মাঠ থেকে বের হয়ে যান মফিকুল হাসান তৃপ্তি এবং দলের উপজেলা সভাপতি হাসান জহির ও তাদের অনুসারীরা। শেষ দিকে এসে হাসান জহিরকে কয়েকটি সমাবেশে দেখা গেলেও মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে শুধু একটি সমাবেশে পান ধানের শীষের প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসান জহির এবং মফিকুল হাসান তৃপ্তির সদলবলে নীরবতা যশোর-১ আসনে ধানের শীষের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনের অবস্থা আরও নাজুক। দলের ঝিকরগাছা উপজেলা সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সাবিরা সুলতানাকে প্রায় একাই নির্বাচনী ময়দান চষে বেড়াতে হয়েছে। দলের দুই উপজেলার কোনো সিনিয়র নেতাকে তার সঙ্গে পাওয়া যায়নি। জেলা বিএনপির সভাপতিসহ দুই-একজন নেতা এক-দুইবার কিছু কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগন্য ছিল। ফলে বিজয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকা এই আসনটি হারাতে হয়েছে বিএনপিকে।
একই ধরনের অভিযোগ যশোর-৪ (বাঘারপাড়া, অভয়নগর উপজেলা ও বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) আসন নিয়েও রয়েছে। এই আসনে প্রথমে দলের মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কৃষকদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, টিএস আইয়ুব সরাসরি বিএনপি প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেন। দুটি উপজেলায় তার বিরাট ভোট ব্যাংক ছিল, যা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে যায়। ফলে নিশ্চিত পরাজয় থেকে এই আসনে বিপুল ভোটে বিজয় অর্জন করেছেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী গোলাম রসুল।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে দলের উপজেলা সভাপতি শহিদ ইকবাল হোসেনকেও প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এই আসনে প্রার্থী করা হয় জোট শরিক রশিদ আহমাদকে। তিনি ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচন করে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন।
পক্ষান্তরে শহীদ ইকবাল হোসেন দলীয় মনোনয়ন হারিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হন তিনি। এই আসনে শহিদ ইকবাল হোসেন ও ধানের শীষের প্রার্থীর মিলিত ভোটের সমান পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। যদিও আসনটিতে জেতার জোরালো সম্ভাবনা ছিল ধানের শীষের।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণকে প্রথমে যশোর-৬ (কেশবপুরপুর) আসনে প্রার্থী করা হলেও পরে তাকে সরিয়ে প্রার্থী করা হয় বিএনপির কেশবপুর উপজেলা সভাপতি আব্দুস সামাদ আজাদকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি উপজেলায় বিএনপিকে একটি গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না।
বিগত সরকারের আমলে যখন আন্দোলন-সংগ্রাম তুঙ্গে ছিল, তখন আব্দুস সামাদ আজাদ বিদেশে পরিবারের কাছে চলে যেতেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। এ কারণে ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে বলে মনে করেন যশোর জেলা বিএনপি নেতারা।
স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পরবর্তী পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে তার খেসারত দিতে হয়েছে দলটিকে। পুরো পুনর্নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রতিটি আসনেই এই বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্থানীয় নেতাদের আচরণে মনে হয়েছে, এসব আসনে ধানের শীষ বিজয়ী হোক তা তারা চাননি। অনেকের মনোভাব এমন ছিল যে, ‘দলতো ক্ষমতায় আসছেই, আমার আসনে না জিতলে কোনো সমস্যা নেই’। যার খেসারত হিসেবে জেলা পাঁচটি আসন জামায়াতে ইসলামীর কাছে হারাতে হয়েছে বিএনপিকে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিএনপির তুলনায় জামায়াতে ইসলামী ছিল কয়েকগুণ বেশি সংগঠিত। তারা ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে। এক্ষেত্রে তারা দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করলেও প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লাকে সামনে রেখে নির্বাচনী কৌশল সাজিয়ে এগোতে থাকে। কে প্রার্থী তা মুখ্য না করে, তারা জনগণের সামনে দাঁড়িপাল্লা এবং দল হিসেবে জামায়াতকে তুলে ধরে। যার সুফল তারা পেয়েছে যশোরের পাঁচটি আসন জয়ের মাধ্যমে।
ঝিনাইদহ জেলা
ঝিনাইদহ-১ আসনে (শৈলকুপা) বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আসাদুজ্জামান আসাদ বিপুল ভোটের ব্যবধানে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শৈলকুপার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলে মিশে কাজ করেছেন। এ ছাড়া, তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শৈলকুপার রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট, মসজিদ, মাদ্রাসা, গির্জা ও মুন্দিরসহ প্রায় ৩শ কোটি টাকার মতো কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি অশান্ত শৈলকুপাকে শান্ত করেছেন। এর ফলে শৈলকুপা উপজেলার মানুষ ভোট দিয়েছেন।
ঝিনাইদহ-২ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। প্রায় বিশ হাজার ভোটের ব্যবধানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক আলী আজম মো. আবু বকরের কাছে হেরেছেন ধানের শীষের প্রার্থী। বিএনপির পরাজয়ের পিছনে দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং অন্যতম কারণ। এছাড়া, এই আসনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ভোটের ফলাফলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, যার কারণে আব্দুল মজিদের পরাজয় হয়েছে।
ঝিনাইদহ-৩ সীমান্তবর্তী এই আসনটি বরাবর জামায়াত অধ্যুষিত। তাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক মতিউর রহমান সহজেই জিতেছেন। ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ নারী ভোটার।
ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনে প্রায় ৬ হাজার নারী কর্মী রয়েছে জামায়াতের। এই ভোট ব্যাংক দিনশেষে ধানের শীষের সাথে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা মো. মতিউর রহমান।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন রাশেদ খান। মূলত এই আসনটিতে ত্রিমুখী লড়াই হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি’র বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী দুটি গ্রুপ ছিল। ভোটের মাঠেও সেই গ্রুপিংয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। ফলে ধানের শীষ ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মাঝে দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে বিএনপির ভোট। আর এতেই জয় পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালেব।
কুষ্টিয়া জেলা
কুষ্টিয়া-১: বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজা আহাম্মেদ, কুষ্টিয়া-২: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আব্দুল গফুর, কুষ্টিয়া-৩: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুফতি আমির হামজা, কুষ্টিয়া-৪: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আফজাল হোসেন বিজয়ী হয়েছেন।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে বিএনপি প্রার্থী রাগিব রউফ চৌধুরী হেরেছেন। নমিনেশন চূড়ান্ত হওয়ার পরও দলের কেন্দ্রীয় নেতা, বিশেষ করে অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধিতা ও মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত আন্দোলনের কারণে। বিএনপির ভোট ব্যাংকগুলো শহিদুল ইসলামের মনোনয়ন না পাওয়ায় রাগিব চৌধুরীর বিরুদ্ধে কাজ করেছে। কেন্দ্রীয় চাপে মিল হলেও ভোটে বিএনপির পক্ষে ভোট পড়েনি। ৫ আগস্টের পরে মিরপুর ও ভেড়ামারায় শহিদুল ইসলামের কর্মীরা যে পরিমাণ চাঁদাবাজি ও দখলবাজি করেছে, তার কারণে মানুষ ভোট দেননি। ভোটের ফলাফলের পরও বিএনপির গ্রুপিং এই আসনে প্রকাশ্যে চলমান ছিল।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জেলা কমিটি ও বিএনপির শহর কমিটি নিয়ে দ্বন্দে দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়েছিল, যা নিরসন হয়নি। এই আসনে সোহরাব উদ্দিন মনোনয়ন না পাওয়ায় বড় একটি অংশ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী জাকির সরকারের বিরোধিতা করেছে। দলীয় ইগোর কারণে সোহরাব গ্রুপ এবং অন্যান্য বিএনপির নেতাকর্মীরা বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করতে মাঠে গোপনে নেমেছে। এছাড়া, বালুমহল, শহর নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রুপিং-ও এই আসনে পরাজয়ের কারণ। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সোহরাব উদ্দিন ও পদে থাকা বিএনপির নেতাদের অসহযোগিতা।
কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনে বিএনপির মনোনয়ন চাওয়া শেখ সাদি ও নুরুল ইসলাম আনছার প্রামানিক তাদের মনোনয়ন না পাওয়ায় বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান করেছেন। ভোটের আগে পর্যন্ত তাদের সমন্বয় করতে ব্যর্থ হয় দল। জামায়াত প্রার্থী এই আসনে ভোট কিনেছে লিফলেট বিতরণের সময় পোস্টারের সঙ্গে। এই আসনের বড় সমস্যা ছিল শেখ সাদির নিজস্ব কোম্পানির চাকুরীজীবিদের নিয়ে বিপক্ষে অবস্থান। সর্বপরি কুষ্টিয়ার তিনটি আসনেই মনোনয়ন ও কয়েকজন নেতার পদের আশা হারিয়েছে ধানের শীষ।
অন্যদিকে, নির্বাচনের দিনও বিএনপির বিরোধিতা চলমান ছিল। এজন্য বিএনপির এই অবস্থা হয়েছে। এছাড়া, জামায়াতের পক্ষ থেকে নারীদের মোটিভ করা হয়েছে। তবে বিএনপির পক্ষে তেমন ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ভোট চাইনি কোনো নেতৃবৃন্দ। যেটুকু করেছেন, তা প্রার্থীকে দেখানোর জন্য। তবে তিনটি আসনেই যোগ্য ছিলেন বিএনপির প্রার্থীরা।
চুয়াডাঙ্গা জেলা
এবারের নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনে প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয় ছুঁতে পারেনি বিএনপি। দুটি আসনই গেছে জামায়াতের ঘরে। দলের মধ্যে অন্তর্কন্দোল, সমন্বয়হীনতা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং ভাসমান ভোটারদের টানতে না পারার ব্যর্থতায় ধানের শীষের পরাজয়ের কারণ বলছেন নেতাকর্মী ও সচেতন মানুষ। সেখানে দাঁড়িপাল্লা অনেকটা নীরব থাকলেও কৌশলে জয় ছিনিয়ে এনেছে।
নির্বাচনের আগে মাঠে ব্যাপক সরব ছিল বিএনপি। তবে ভোটের ফলাফলে পরাজয় মানতে হয়েছে দলকে। চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষের ভোট ব্যবধান ৫৭ হাজার। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে তা ৪৪ হাজার।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাসুদ পারভেজ রাসেল ভোট পেয়েছেন ২ লাখ ১১ হাজার ৪১টি। ধানের শীষের শরীফুজ্জামানের প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৩।
চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে দাঁড়িপাল্লার রুহুল আমিন ভোট পেয়েছেন ২ লাখ ৮ হাজার ১১। ধানের শীষের মাহমুদ হাসান খান পেয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৭ ভোট।
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ মিল্টন বলেন, “আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তির কারণ অন্যতম। ভবিষ্যত বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।”
মেহেরপুর জেলা
এবারের নির্বাচনে মেহেরপুর জেলার দুটি আসনের জামায়াত সমর্থিত ও জোটপ্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
মেহেরপুর-১ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী তাজউদ্দীন খান ১ লাখ ২২ হাজার ৮২৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাসুদ অরুন পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ২২৪ ভোট। এ আসনে বিজয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬০৫ ভোটে।
মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী নাজমুল হুদা ৯৪ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আমজাদ হোসেন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৬৮৯ ভোট। দু’জনের মধ্যে ভোট ব্যবধান ৮ হাজার ৪৭৯। মূলত জামায়াত ৫ আগস্টের পর থেকে সুসংগঠিতভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটেছেন। সেই তুলনায় বিএনপি ছিল অনেকটা অগোছালো।
নড়াইল জেলা
নড়াইলের দুটি আসনের একটিতে বিএনপি এবং একটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
নড়াইল-১ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম ৯৯ হাজার ৯৭৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ওবায়দুল্লাহ ৭৫ হাজার ২২৫ ভোট পেয়েছেন।
নড়াইল-২ আসনে জেলা জামায়াতের আমির আতাউর রহমান ১ লাখ ১৮ হাজার ১৪২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কলস প্রতীকের মনিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট পেয়েছেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় এ জেলায় বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সমান অবস্থান করেছে।
মাগুরা জেলা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরার দুটি আসনেই জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
মাগুরা-১ আসনে বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এবং ধানের শীষের প্রার্থী মনোয়ার হোসেন। মাগুরা-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বিজয়ী হয়েছেন। এ জেলায় ঐক্যবদ্ধ বিএনপি থাকায় জামায়াতের দুই প্রার্থী ধরাশায়ী হয়েছেন।
প্রতিবেদনে সহযোগিতা করেছেন: এসএম সোহান, শেখ তানজির আহমেদ, সরোয়ার হোসেন, এম রবিউল ইসলাম রবি, মো. জাহিদ হাসান, জিসান আহমেদ, জুলফিকার আলী কানন, জয়ন্ত পোদ্দার।
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন






