আট দলের ১১ দলে রূপান্তরিত হওয়ায় নতুন জটিলতা
দৈনিক জনতার দেশ ডেস্ক :আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দফায় দফায় বৈঠক, পারস্পরিক অভিযোগ ও অসন্তোষের পরও জোটভুক্ত দলগুলোর নেতারা বলছেন, জোট ভাঙার কোনো আশঙ্কা নেই। বরং শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে ছাড় দিয়ে হলেও সমঝোতায় পৌঁছানো হবে।
নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি।
সেই সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চাপ বাড়ছে ১১ দলীয় জোটের ওপর। এখনো ৩০০ আসনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছড়ালেও জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করা হবে।
আট দল থেকে ১১ দলে রূপান্তর, জটিলতা সেখানেই
নির্বাচনের আগে গণভোট, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও সমমনা দলগুলো নিয়ে প্রথমে আট দলীয় মোর্চা গঠিত হয়। ওই জোটে শুরু থেকেই আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছিল।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) যুক্ত হলে জোটের আকার দাঁড়ায় ১১ দলে। নতুন দল যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের হিসাব নিকাশ ভেঙে পড়ে এবং আসন বণ্টন নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়।
২৮ ডিসেম্বর আট দলের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, এনসিপি ও এলডিপি আসন সমঝোতায় যুক্ত হচ্ছে। পরে এবি পার্টি যুক্ত হলে জোট আরও বিস্তৃত হয়।
কিন্তু জোট যত বড় হয়েছে, সমঝোতার পথ তত জটিল হয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা, দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত জোটভুক্ত দলগুলো নিজেদের অবস্থান থেকে ব্যাপকসংখ্যক আসনে প্রার্থী দেয়। জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি, এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
একই আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেওয়ায় জোটের ভেতরে টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে তখনই অসন্তোষের সুর শোনা যায়।
ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ ও অভিযোগ
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরদিনই ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলন ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সমঝোতা হচ্ছে না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসলামী আন্দোলন কেন জামায়াতের কাছে আসন চাইবে। এক বাক্স নীতি প্রথম ঘোষণা করে ইসলামী আন্দোলন। তাদের যুক্তি—যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই আসন বণ্টন হওয়া উচিত।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত নতুন শরিক এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এনসিপি, এবি পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হওয়ায় আগে যে আসনগুলোতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। এতে তৃণমূল পর্যায়েও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “কেউ যদি ২০টি আসনে যোগ্য হয়, তাকে ২০টিই দেওয়া উচিত। আবার কেউ যদি ৮০ আসনে শক্ত অবস্থানে থাকে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।”
জামায়াতের অবস্থান: সংখ্যার চেয়ে জয়ের সম্ভাবনা
জামায়াতে ইসলামী বলছে, তারা আসনের সংখ্যার চেয়ে জয়ের সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলানিউজকে বলেন, “আমরা সর্বোচ্চ আসনে বিজয়ী হতে চাই। এজন্য এমনভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা দরকার, যাতে জোটের পক্ষ থেকে যিনি নির্বাচন করবেন, তিনি জয়লাভ করতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, বড় ভাইসুলভ আচরণ কেউ করছে না। সবাই পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখেই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে এবং ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করেন, ইসলামী আন্দোলন ৭০ থেকে ৭৫টি আসন চাচ্ছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি বলেন, “এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে কি না, সেটিও ভাবতে হবে। অতীতেও ইসলামী ঐক্য ভাঙার ষড়যন্ত্র হয়েছে।”
সমাধানের পথে সম্পর্কের বরফ গলছে
সব টানাপোড়েনের মধ্যেও সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। উভয় পক্ষই এখন ছাড় দেওয়ার মানসিকতার কথা বলছে।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির ফয়জুল করীম বাংলানিউজকে বলেন, “জনগণও চায়, রাজনৈতিক দলগুলোও চায় ঐক্য। ইনশাল্লাহ জোট ভাঙবে না। খুব দ্রুত এর সমাধান হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতের কথাবার্তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে বিষয়ে সবাই সতর্ক থাকবে।”
অন্যান্য শরিকদের অবস্থান
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, “আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। কিছু আসনে সব দলের সম্মিলিত জরিপ করার কথা থাকলেও তা এখনো হয়নি।” তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, তিন–চার দিনের মধ্যে আলোচনার একটি পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
এনসিপি ও এবি পার্টির মধ্যেও আসনসংখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এনসিপি শুরুতে ৫০টি আসন চাইলেও জামায়াতের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে ৩০টি আসনে সমঝোতার আশ্বাস পায়। কিন্তু কোন ৩০টি আসন তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এজন্য শেষ মুহূর্তে এনসিপিও ৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে রেখেছে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “জোটের নাম, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আসন সমঝোতা কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত নয়। আলোচনা চলছে।”
সময়ের চাপ ও ভবিষ্যৎ
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা সামনে রেখে জোটের ওপর চাপ বাড়ছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকেও আসন সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, “মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে। তার আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।”
ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম সাংবাদিকদের বলেন, “সমঝোতা হবে কি না, তা পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ইসলাম, দেশ ও মানবতার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে।”
(জনতারদেশ/রুপম–আহমেদ/প/ম )
খবর পেতে দৈনিক জনতার দেশ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন






